lithium battery fire

মোবাইলের লিথিয়াম ব্যাটারি কেনো বিস্ফোরিত হয় ?

09/15/2019

ব্যাটারি বিস্ফোরণের অভিযোগ উঠার পর তাৎক্ষণিকভাবে স্যামসাং সদ্য রিলিজ পাওয়া গ্যালাক্সি নোট ৭ এর বিক্রি বন্ধ করে দেয় এবং বিক্রিত নোট ৭ গুলোও ফেরত নেওয়া শুরু করে। টেক জায়ান্ট স্যামসাংয়ের এটি একটি অসাধারণ পদক্ষেপ ছিলো।

পরবর্তীতে সংস্থাটি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মোবাইলটির ব্যাটারিতে সমস্যার জন্যই বিস্ফোরণের মতো মারাত্মক দূর্ঘটনা ঘটেছে। তবে তারা বিস্তারিতভাবে কিছুই বলেনি। 

সাধারণত লিথিয়াম আয়নযুক্ত কোনো ব্যাটারিকে যদি খুব দ্রুত চার্জ দেওয়া হয় অথবা সামান্যতম ম্যানুফেকচারিং ত্রুটি থেকেও শর্ট সার্কিট হয়ে আগুণ লেগে যেতে পারে। আর তারপর নিশ্চিতভাবে বিস্ফোরণ। 

লিথিয়াম আয়ন খুব সংবেদনশীল হওয়ায় যদি শতভাগ নিখুতভাবে ম্যানুফেকচারিং করা না হয় বা চার্জিং ব্যবহারবিধি মেনে চলা না হয় তাহলে দূর্ঘটনার আশংকা বেড়ে যায়। 

কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি স্টোরেজ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ক্লেয়ার গ্রে বলেন, এই ব্যাপারটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক কারণ মোবাইল আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য জিনিস। আমাদের উচিত নিরাপদ বিকল্প খুঁজে বের করা।  তিনি ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে লিথিমায়ের বিকল্প খুঁজে বের করার জন্য অনুরোধ জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন,  লিথিয়ামের বিকল্প বের করা সম্ভব হলে গবেষণা এবং শিল্পখাতে যুগান্তকারী এক সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। 

আপনি জানলে অবাক হবেন, দিনের প্রায় চব্বিশ ঘন্টাই যে বন্ধুটি আপনাকে অনবরত সঙ্গ দিয়ে আপনার দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সহজ করছে তাই আপনার মৃত্যুর কারণ হয়ে যেতে পারে নিমিষেই। আমাদের মোবাইলে লিথিয়াম আয়নের ব্যাটারিটি ব্যবহার করা হয়। এটা যে কতটা ভয়নাক তা জানলে অনেকেই মোবাইল ব্যবহার করাই ছেড়ে দিতেন। সাধারণত মোবাইলে যেকোনো ম্যানুফেকচারিং ত্রুটির জন্য ব্যাটারিতে আগুণ ধরে যায়। আগুণ থেকে হয় বিস্ফোরণ। 

ধরুণ, আপনি পেট্রোল, ডিজেল চালিত কোন গাড়ির মধ্যে বসে আছেন তখন কোনো আগাম সংকেত না দিয়েই ব্যাটারিতে আগুণ ধরে গেলো। কি হতে পারে তারপর ভেবে দেখেছেন একবার ? 

তবে অধ্যাপক গ্রে লোকজনকে আতঙ্কিত হতে বারণ করেছেন। কারণ মোবাইলফোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই মোবাইল বাজারে ছাড়ে। আর দূর্ঘটনা তো দূর্ঘটনাই। আদতে আমরা সকলেই প্রত্যেকটা মুহুর্ত জীবনের ঝুঁকিতে থাকি। 

ব্যাটারি বিস্ফোরণের সাধারণ কারণ

স্যামসাং বলেছে, বিশ্বজুড়ে গ্যালাক্সি নোট ৭ এর প্রায় ২৫ লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়েছে। এরমধ্যে সারা বিশ্বে মাত্র ৩৫ টি কপিতে বিস্ফোরণ সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে। 

স্যামসাংয়ের মতোই প্রায় প্রতিটা মোবাইলফোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ব্যাটারিতে লিথিয়াম আয়ন ব্যবহার করে। এটা আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে কোনোভাবে অনিরাপদ করে তুলছে কী ?

এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে মোবাইলের ব্যাটারিতে লিথিয়াম আয়ন কিভাবে ব্যবহার করা হয় এটা জানা জরুরী। 

সাধারণ ব্যাটারির মতোই মোবাইলের ব্যাটারিতে একটি ক্যাথোড, একটি এনোড এবং সাথে লিথিয়াম থাকে। ইলেক্ট্রোলাইট নামক এক প্রকার জৈব তরল পদার্থ দিয়ে এনোড এবং ক্যাথোডকে আলাদা করা হয়। তবে মাঝখানে ছোটো একটি ছিদ্র থাকে যা দিয়ে লিথিয়াম এনোড এবং ক্যাথোডে ভ্রমণ করে। 

দ্রুত চার্জ

মোবাইল খুব দ্রুত বা কুইক চার্জ হতে থাকলে ক্রমাগতভাবে তাপ উৎপন্ন হতে থাকে। এর ফলে এনোডের চারপাশে ঘুরতে থাকা লিথিয়াম প্লেটগুলোর মধ্যে শর্ট সার্কিট তৈরি হতে পারে। তবে প্রত্যেকটা মোবাইলেই নিজস্ব একটি ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থাকে। এই ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমটি আপনার ফোনটিকে ঠিক কোন মাত্রায় চার্জ করা উচিত, চার্জ শেষ হয়ে গেলে ব্যাটারিতে বিদ্যুতের প্রবাহ রোধ, এবং ব্যাটারি থেকে পাওয়ার সাপ্লাই নিয়ন্ত্রণ করে। এই সিস্টেমটি লিথিয়াম আয়নের তাপ উৎপাদন হ্রাস করার জন্য ব্যাটারিতে ধীরগতিতে বিদ্যুৎ সঞ্চারিত করে। আর এজন্যই আমাদের ফোন চার্জ হতে এতো সময় লাগে।

এখন কুইক চার্জ ছাড়াও শর্ট সার্কিটের সম্ভাব্য আরও কিছু কারণ নিয়ে আলোচনা করব।

ম্যানুফ্যাকচারিং এর সময় ব্যাটারিতে যদি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কোনো ছিদ্রও থেকে যায়তাহলে চার্জ দেওয়ার সময় লিথিয়াম আয়নগুলো বাতাসের সংস্পর্শে এসে ব্যাটারিতে দুষণ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে লিথিয়াম আয়ন সামান্য চার্জেই অধিক তাপ উৎপাদন করা শুরু করে। তবে বেশ কয়েকবার ব্যাটারি চার্জ না হওয়া অবধি এই সমস্যাটা স্পষ্ট হয় না। 

আশার কথা হলো, বিগত ১০-১৫ বছরের তুলনায় এখন ম্যানুফেকচারিং বহুলাংশে মানসম্মত হয়েছে। এছাড়া ম্যানুফেকচারিং-এ নিতাপত্তার ব্যাপারটিকে আজকাল সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

উল্লেখ্য যে, ব্যাটারিপ্যাক যতো বেশি হবে ঝুঁকিও ততো বেশি। এই যেমন ধরুণ, আপনার ল্যাপটপের ১২ সেলের ব্যাটারি। এক কথায়, যতো বেশি পরিমাণ লিথিয়াম আপনি বহন করবেন ঝুঁকিও ততো বেশি।

এই ত্রুটিগুলো বের হওয়ায় একভাবে ভালোই হচ্ছে। উদ্ভাবনের দিগন্তে নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে। আর উদ্ভাবকদের সামনে সাফল্যের নতুন দোয়ার উন্মোচনের সুযোগ। 

ব্যাটারি বিস্ফোরণের লক্ষণ

মোবাইল যন্ত্রাংশের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান গীক স্কোয়াড জানিয়েছে, ব্যাটারি বিস্ফোরণের আগে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন – ব্যাটারি ফুলে উঠা। 

এ বিষয়ে তাদের ওয়েবসাইটে আরও উল্লেখ্য করা হয়েছে, কোনো কারণে ব্যাটারির কোষগুলো ফেঁটে যেতে শুরু করলে লিথিয়াম আয়ন ভাঙতে শুরু করে এবং ব্যাটারি ফুলে যায়। 

তাই যদি দেখেন যে আপনার ফোনের ব্যাটারিটি ক্রমশ ফুলে যাচ্ছে অথবা মোবাইল মাত্রাতিরিক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে তাহলে অবশ্যই আপনার অভিজ্ঞ কোনো মোবাইল মেকানিকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। 

তবে মোবাইল হালকা গরম হলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই। এখনাকার মোবাইলগুলোতে মান টিকিয়ে রাখতে প্রসেসরগুলোর ক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়ার হয়। ফলে মোবাইল একটু আধটু গরম হয়ে যায়। হাই পারফর্মিং মোবাইল ফোনগুলোর ক্ষেত্রে এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।

নিয়ন রহমান

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি