আপনি কেন উদ্যোক্তা হতে চান?

12/13/2019


উদ্যোক্তা শব্দটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। সময়টাই যেন এখন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার বা তৈরী করার।  কেউ অন্যকে দেখে উৎসাহিত হয়ে উদ্যোক্তা হতে চান তো কেউ আবার নিজ গুনেই হয়ে ওঠেন উদ্যোক্তা। কিন্তু আসলেই কি সবাই জেনে বুঝে  উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পন্থাটা অবলম্বন করেন? 

উদ্যোগ থেকে উদ্যোক্তা
কাকে উদ্যোক্তা বলা যাবে আর কাকে বলা যাবে না এ নিয়ে কিছুটা সংশয় থেকেই গেছে। সব ব্যাবসার জন্যই উদ্যোগ প্রয়োজন কিন্তু সব ব্যাবসায়ীকে কি উদ্যোক্তা বলা যায়?  তাহলে উদ্যোক্তা আসলে কারা? কাদের আমরা উদ্যোক্তা বলব? 

উদ্যোক্তা না ব্যাবসায়ী? 
১.
রোমেল এম.এ পাশ করে অনেক চেষ্টা তদবির করেও চাকরির ব্যবস্থা করতে পারেনি। অবশেষে  বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে রংপুর শহরে সিম্ফোনি মোবাইলের একটি ফ্রানচাইজ খুলে।

অন্যদিকে নোমান কারমাইকেল এ অনার্স ফাইনাল শেষ করে। ডিজাইনের প্রতি তার প্রচুর আগ্রহ। নিজে নিজে টিউটোরিয়াল দেখে কাজ শিখে ফ্রিল্যান্সিং করছে। একসময় কাজের প্রতি নেশা থেকে আরো ভালো কিছু করার স্বপ্ন জমাট বাধে। বাজারে এত কাজ যে সে একা করে উঠতে পারে না। তখন ঠিক করে আরও ছেলে-মেয়েকে কাজ শিখিয়ে একটি টিম গঠন করবে। এজন্য তার প্রফেশনাল  স্কিলের জায়গা থেকে কিছুটা ঘাটতি আছে সেগুলো পুরন করতে হবে। প্রফেশনাল কোর্স করে এরপর সে নিজ উদ্যোগে একটি প্রতিষ্ঠান দাড় করায় যেখানে আরও ছেলেমেয়েদের ট্রেইনিং দেয়া হয়। এভাবে তার একটি টিম তৈরি করে।  

২. গৃহিণী  মরিয়ম অবসর সময়ে কিছু করতে চায়। রাজশাহীতে নিজ বাড়িতে ছোট আকারে শুরু করে  মেয়েদের থ্রিপিস, শাড়ি জুয়েলারি, ব্যাগ ইত্যাদি ব্যাবসা। মাসে দু’বার ঢাকার পাইকারি মার্কেট থেকে পন্য গুলো কিনে এনে মুনাফা যোগ করে বিক্রি করে। 

অন্যদিকে  মিজির ছোট বেলা  থেকেই স্বপ্ন ছিল ফ্যাশন ডিজাইনার হবার। দেশীয় পণ্য দেশ- বিদেশে সমাদৃত হবে সে স্বপ্ন বুকে নিয়ে অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে চামড়াজাত পণ্য নিয়ে তৈরী করে তার নিজস্ব ব্র্যান্ড। মিজির  চমৎকার ডিজাইন করা লেদারের ব্যাগ, জুতো, জ্যাকেট ইত্যাদি এখন বিশ্ব সমাদৃত। দেশের গন্ডি পেরিয়ে মিজির তৈরী করা পন্যের ব্যাপক চাহিদা এখন ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ  বিভিন্ন দেশে! 

৩. শ্রাবন্তি অনলাইনে ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি ড্রেস সেল করে। এক কালীন মুল্ধন দিয়ে সে আর তার বান্ধবী মিলে বিজনেসটি আরম্ভ করে। প্রতিযোগীমূলক বাজারে তাদের সবসময় বাকিদের সাথে পাল্লা দিয়ে নতুন নতুন প্রোডাক্ট মজুদ করতে হয়। কখনো ব্যাবসায় লাভ হয় তো কখনো একদমই মন্দা।

কান্তা ছোটবেলা থেকেই এটা সেটা বানিয়ে ঘরের সাজ-সজ্জা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করতে ভীষন ভালোবাসে। তাই আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুবান্ধব তাদের ছোটখাট ঘরোয়া পার্টিতে কান্তাকে দায়িত্ব দেয় সাজিয়ে দেবার। একসময় তার বন্ধুদের অনুপ্রেরনায় উদ্যোগ নেয় তার নিজের ইভেন্ট ম্যাঞ্জমেন্ট কোম্পানি খোলার। এখন তার কোম্পানিতে সে ছাড়াও আরো অনেক ছেলেমেয়ে পার্ট টাইম ও ফুল টাইম কাজ করে

অতএব ব্যাবসা আর উদ্যোগের মাঝে কিঞ্চিত পার্থক্য পরিলক্ষিত। উদ্যোক্তার মধ্যে সবসময় নিজে কিছু করার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য থাকে যেখানে ঝুঁকি আছে, পরিশ্রম আছে, ভালোবেসে লেগে থাকার প্রচেষ্টা থাকে, অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকে এবং বড় হবার স্বপ্ন থাকে। তাই সব উদ্যোক্তাকে ব্যাবসায়ী বলা গেলেও সব ব্যাবসায়ীকে উদ্যোক্তা বলা যায় কি?

কোন উদ্যোগ শুরু করার আগে এবং পরিচালনার জন্য যে গুনগুলো একজন উদ্যোক্তার মাঝে থাকা উচিৎঃ

উদ্যোগ ও লক্ষ্য
আত্মপ্রত্যয় হচ্ছে যে কোন উদ্যোগের মূল মন্ত্র। আপনি যদি একজন উদ্যোক্তা হয়ে থাকেন তাহলে একজন  সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে আপনি কেন আলাদা তা আপনার কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে হবে। আপনার উদ্যোগটি সম্পর্কে এবং ইউজারকে কি অফার করতে চাচ্ছেন, সেটার বাজার সম্পর্কে  সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।

ঝুঁকি
উদ্যোগ এবং বাজার সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা লাভ করার পর আপনার জানতে হবে এর প্রতিবন্ধকতা ও ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে। ব্যবসায় লাভ ক্ষতি যেমন আছে তেমনি  ঝুঁকিও আছে। কিন্তু সেগুলো অতিক্রম করার প্ল্যান গুলোও কিন্তু আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে।

নেটওয়ারর্কিং এবং যোগাযোগ
প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আপনার উদ্যোগটি যতই ভালো হোক না কেন, ভালো নেটওয়ার্কিং ছাড়া  কিন্তু সবই পন্ডশ্রম। আপনার প্রোডাক্ট বা সেবা কিভাবে অধিকসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন সেটা নির্ভর করবে আপনার নেটওয়ারকটি কতটা শক্তিশালী। ব্যবসার ক্যাপিটালের উপর নির্ভর করে কে কোন চ্যানেল এর মাধ্যমে বাজারজাত করবে কিন্তু ছোট বা মাঝারি স্টার্টআপ গুলোকে নির্ভর করতে হয় চেনাশোনা গন্ডির ভেতরের মানুষজনদের উপর।

হিসেব- নিকেষ ও পরিচালনায় পারদর্শীতা 
আপনার উদ্যোগ সম্পর্কে পুর্ন ধারনার পাশাপাশি জানতে হবে টাকাপয়সার হিসেব রাখার অভিজ্ঞতা। পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত পুরো সাইকেলটা পরিচালনা করার জন্য দক্ষতা থাকেটা অত্যন্ত জরুরি। সেক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্ট স্কিলের কোন ঘাটতি থকে থাকলে সেটাও পূরণ করে ফেলতে হবে।  

প্রগাঢ় ভালোবাসা
ভালোবেসে কোন কাজ শুধু শুরু করলেই হয় না। এর সফল পরিণতির জন্য শেষ পর্যন্ত ভালোবেসে ধৈর্যের সাথে  কাজটি সম্পন্ন করতে হয়। যে কোন উদ্যোগ হচ্ছে উদ্যোক্তার কাছে সন্তানের মতো। ছোট থেকে যত্ন করে লালন-পালন করে  বড় করতে হয়। যে কোন উদ্যোগে পারদর্শিতা আর ভালোবাসা ছাড়া সফলতা আশা করা অসম্ভব। 

মাথায় আসা মাত্র অনেকে হুজুগে ঝাপিয়ে পরে সেই কাজটি করার জন্য। কিন্তু আমরা সবাই জানি পরিকল্পনা ছাড়া কোন কাজ করা মানেই বিপদ ডেকে আনার সামিল।  কি করছেন, কেন করছেন, কাদের জন্য করছেন এইসকল প্রশ্নত্তরগুলো আগে জোগাড় করে নিন। আপনার উদ্যোগটি সময়োপযোগী কিনা, কাচামাল এর সাপ্লাই আছে কিনা, মার্কেটে এর চাহিদা আছে কিনা বা কিভাবে তৈরি করবেন, ইউজারদের কাছে কিভাবে পৌছাবেন এর মান   কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন, বিজনেসে রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো কি কি এবং সেগুলো কিভাবে অতিক্রম করবেন, ব্যাবসা শুরু করার আগে এই সকল বিষয় নিয়ে ভালো করে ভেবেচিন্তে তবেই শুরু করুন।