lack-of-sleep

নিদ্রাহীনতা মস্তিষ্কে প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরির অন্যতম বাধা

অক্টোবর ৩০, ২০১৯

আমরা খুব ঘুম প্রিয় মানুষ। কিন্তু কাজের মধ্যে এই ঘুম কাটানোর জন্য আমরা চা-কফি খাই। তখন আবার বেশ সতেজ লাগে। যারা আবার বেশি চিন্তা করে তাদের ঘুম কম হয়। বেশি ঘুমানো যেমন শরিরের জন্য ঠিক না তেমন কম ঘুম শরিরের জন্য খারাপ। যাদের ঘুম কম হয় তাদের দেহ মন ও সুস্থ থাকেনা। ঘুমের মাধ্যমে মস্তিস্কে এক ধরনের প্রোটিন তৈরি হয় যা আমাদের স্নায়ু বিকাশের জন্য খুব ই গুরুত্বপূর্ণ ।

আমাদের দেহে একপ্রকার ঘড়ি আছে যা “দেহঘড়ি” নামে পরিচিত। বাংলার লোকাঞ্চলের অনেক গানের মধ্যে দেহঘড়ির কথা বলা আছে । তবে বিজ্ঞানের ভাষায় এই দেহ ঘড়ি কাজ করে বাইরের আলো এবং কিছু ডার্ক সিগনাল পেলে। এই ঘড়ি চলে এর নিজস্ব রিদমে । এই রিদম পরিচালনা করে নিউরন। যে নিউরন গুলো কে “অভ্যন্তরীন টাইমকিপার” বলা হয়। নিউরন গুলো একে অপরের সাথে মিলিত হয়ে সাইন্যাপ্স তৈরি করে। মিলিত হয়ার সময় এরা মস্তিস্কে নানা রকমের সিগনাল পাঠায়। তবে ঘুমানোর পরে ও এরা কিভাবে জেগে থেকে স্নায়ু বিকাশে অংশ নেয় তা এখনো রহস্যময় হয়ে আছে।

আমাদের যখন ঘুম আসে তখন থেকে শুরু করে ঘুমানো পর্যন্ত নিউরনের নোড গুলো একে অপরের সাথে মিলিত হয়ে সাইন্যাপ্স তৈরি করতে থাকে। ঘুমানোর পরে টাইমকিপিং কোষগুলো সাইন্যাপ্স এর চারিদিকে ঘুড়ে ঘুড়ে সিন্যাপ্টিক প্রোটিন তৈরি করার জন্য অপেক্ষা করে। যাদের ঘুম হয়না বা ঘুম কম হয় তাদের ক্ষেত্রে এই চক্রের ব্যাঘাত ঘটে।

ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের সাউথ ওয়েস্টার্ন মেডিকেল সেন্টারের একজন নিউরোলজিস্ট রবার্ট গ্রীন এর মতে, মস্তিষ্ক কিছু কাজ এর জন্য যখন প্রস্তুতি নেয় ঠিক তখন আমরা সেই কাজ ই করি বিষয় টা এমন না।যখন আমরা নিদ্রাহীন হয়ে পড়ি তখন দুইটা ফ্যাক্টর কাজ করে । এক হলো ঘুমের চাপ আর দুই হলো ঘুমের প্রতি আকর্ষণ অর্থাৎ ঘুমানো দরকার এই ধরনের জিনিস মাথায় চলতে থাকে। এই ধরণের চিন্তাগুলোর সময় মস্তিস্কের নিউরন গুলো ব্রেনে সিগন্যাল পাঠায় যে এখন ঘুমানোর সময় , বা ঘুমানোর দরকার। কিন্তু এই সিগন্যাল ব্রেন পাওয়ার সাথে সাথেই আমরা ঘুমিয়ে পড়িনা।

একটি গবেষণায় (Sara B. Noya, 2019)জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি এবং টক্সিকোলজি ইনস্টিটিউটের সারা বি নোয়া এবং তার সহকর্মীরা একটা ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করেছিলেন।এক্ষেত্রে তারা দেখেছিলেন অভন্তরীন ঘড়িটা শুধু প্রজনন বা ডিএনএ অনুলিপনের জন্য প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে।কিন্তু যখন ইঁদুরকে ঘুমাতে দেয়া হয়না তখন প্রোটিন তৈরির জন্য কিছু ট্রিগারের উপস্থিতি দেখা যায়।

তারা আরো দেখিয়েছিলেন , ২৪ ঘন্টার মধ্যে দুইবার (একবার ঘুম থেকে উঠার আগে এবং ঘুমানোর আগে ) মস্তিষ্কের ‘চিন্তা করা’র অঞ্চলসমূহের নিউরনগুলো প্রতিলিপন করে টাইম-কিপিং সেলের ষ্টেশনগুলোকে পরিপূরণ করে রাখে। ঘুমানোর সময় যেসব প্রোটিনের জন্য প্রতিলিপন হয় সেগুলো আরো অন্যান্য প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে। আর জেগে উঠার সময় প্রতিলিপি গুলো সাইন্যাপ্স এর সাথে যুক্ত হয় প্রোটিন তৈরির জন্য। ঘুমানোর সময় কিছু লুকানো মলিকিউল সাইন্যাপ্স গুলোকে দ্রুত সতেজ করার জন্য প্রস্তুত করতে থাকে।

এই রেগুলার ঘুমানো এবং জেগে উঠার চক্র তে প্রোটিন তৈরির হার ভোরে এবং রাতে সবচেয়ে বেশি। ইঁদুরের উপর পরিক্ষা করে দেখা গেছে যখন তাকে ঘুমাতে দেয়া হয়না তখন অন্যান্য অনেক কোষের প্রতিলিপনের মাধ্যমে অনেক প্রোটিন তৈরি হয় কিন্তু যেটা প্রয়োজনীয় প্রোটিন সেটাই তৈরি হয়না। অন্যদিকে যখন কোনো ঘুমের অভাব থাকেনা তখন এই প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি হয়ে সাইন্যাপ্স কে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে।

একটি গবেষণায় (Franziska Brüning, 2019) , মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির মার্টিনস্রেডের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অফ বায়োকেমিস্ট্রিয়ের ফ্রেঞ্চিস্কা ব্রানিং এবং তার সহকর্মীরা  টাইম-কিপিং সেল এর সাথে প্রটি প্রোটিন সংযোগের বিষয়টা গবেষণা করে দেখেছেন ফসফেটের অণু সংযুক্তি বা অপসারণ , প্রোটিনগুলি চালু বা বন্ধ করার জন্য ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। এই তথ্য পাওয়ার পরে এই বিষয় নিয়ে আর কোনো পরীক্ষা করা হয়নি। ফসফেট সম্পৃক্ত প্রোটিন তৈরির হার ঘুম থেকে জেগে উঠার আগ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে যখন ঘুম হচ্ছেনা তখন এর মাত্রা একদম কমে যাচ্ছে।

 সাইন্যাপ্টিক অঞ্চলের আইসোলেশন সম্পর্কে উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের নিউরোলজিস্ট চায়ারা সিরেলি বলেছেন, সিন্যাপ্টিক অঞ্চল গুলোকে আইসোলেটেড করে এই মলিকিউল গুলো অবস্থান করে এবং প্রোটিনকে ঐ অঞ্চলগুলোতে যুক্ত করার জন্য প্রস্তুত করে। প্রতিলিপন গুলো কোথায় হবে, কখন প্রতিলিপনের জন্য তৈরি হবে, কখন প্রোটিন গুলো ফসফেটের সাথে যুক্ত হবে বা হবেনা সেসব কিছু নির্ধারিত হয় এই আইসোলেশনের মাধ্যমে।             

পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের নিউরোলজিস্ট অখিলেশ বি রেড্ডি বলেছেন, গবেষণা গুলো ইঁদুরের উপর হলেও মানুষের জন্যে ফলাফল একই হবে কারণ ইঁদুর, মানুষের বিকল্প হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে তাই গবেষণায় এই প্রানীকে মানুষের বিকল্প হিসেবে ধরা যায়।

তিনি আরো বলেছেন, এই গবেষণা থেকে ঘুমের সময় আমাদের মেমরি-সেল গুলো কিভাবে একত্রিত হয় তার ধারণা পাওয়া যায় কিন্তু ভবিষ্যতে মেমরি-সেল গুলো কিভাবে কাজ করবে বা স্মৃতি বাড়া কমার বিষয়টি এই গবেষণার সাথে সম্পৃক্ত না। এই গবেষণাটি অনেক বিস্তারিত গবেষণার খুব ছোট একটা অংশবিশেষ।

 

References

Franziska Brüning, S. B. (2019). Sleep-wake cycles drive daily dynamics of synaptic phosphorylation. Scopus.

Sara B. Noya, D. C. (2019). The forebrain synaptic transcriptome is organized by clocks but its proteome is driven by sleep. Scopus.