‘গোল্ডেন রাইস’ কতটা গোল্ডেন? – (পর্ব – ১)

সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৫

মনে করুন, সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে বাজারে গিয়েছেন চাল কিনতে। গিয়ে দেখেন, বাজারের সব চালের রং স্বর্ণের মতো। ঘটনা কি? স্বপ্ন দেখছেন নাতো? ভালো করে চোখ কচলে আবার তাকালেন। নাহ! ঠিকইতো আছে। বছরের পর বছর আমরা সবাই যে সাদা রংয়ের চাল দেখে আসছি, হঠাৎ করেই সেগুলো ‘সোনালি’ হয়ে গেলো। চালের দোকানদার আপনার দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসি দিয়ে বল্লো, ভাই, এগুলা ‘গোল্ডেন রাইস’ (Golden Rice)। লইয়া যান, ‘ভাইটামিন এ’ (Vitamin A) ভর্তি।

উহু, মিথ্যা বলছি না। কয়েক বছরের মধ্যেই এই গোল্ডেন রাইস, মানে সোনালি চাল বাংলাদেশেও পাওয়া যাবে।

পুরো বিষয়টা খুলে বলি। রাতকানা রোগের (Night blindness) নাম তো শুনেছেন। ‘ভাইটামিন এ’ এর অভাবে এই রোগ হয়। প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে এই রোগে কয়েক লক্ষ শিশু আক্রান্ত হয়। ‘ভাইটামিন এ’ এর অভাবে শিশু বয়সেই অন্ধ হয় আরো কয়েক লক্ষ শিশু। এছাড়া ডাইরিয়া, অন্ত্রের রোগ এবং শিশুদের বিভিন্ন রোগের কারণ ভাইটামিন এ’র অভাব।

পৃথিবীর যে সব দেশে প্রধান খাবার ভাত, সাধারণত সে সব দেশের শিশুরাই ভাইটামিন এ’র অভাবে বেশি ভোগে। বিশেষ করে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দরিদ্র, স্বল্পোন্নত দেশগুলো। কারণ হলো পর্যাপ্ত ভাইটামিনের জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে ফল-মূল, শাক-সব্জি, কিন্তু দাম বেশি হবার কারণে এসব শিশুরা তা খেতে পায় না। আর যে ভাত খায়, তাতে পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয় না।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ দিন ধরেই এই সমস্যা সমাধানের জন্য চিন্তা করছিলেন। ফিলিপাইনে একবার এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে একজন বক্তা প্রস্তাব করলেন, যেহেতু এসব দেশের মানুষের প্রধান খাবার ভাত, সেহেতু ভাতের মধ্যে, মানে চালের মধ্যে ‘ভাইটামিন এ’ ঢুকিয়ে দিলে কেমন হয়? তাইতো, বুদ্ধিটাতো চমৎকার। ব্যাস, বিজ্ঞানীরা আশার আলো খুঁজে পেলেন। এবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার পালা সত্যি সত্যি এভাবে সমস্যার সমাধান হয় কিনা।

এই হলো গোল্ডেন রাইসের শুরুর ঘটনা। এবার গোল্ডেন রাইস কিভাবে এলো সেই গল্পটা বলি। বিজ্ঞানী Ingo Potrykus সুইজারল্যান্ডের এক গবেষণাগারে জৈব প্রযুক্তি (Biotechnology) নিয়ে গবেষণা করছিলেন। চালের মধ্যে ‘ভাইটামিন এ’ কিভাবে যোগ করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। সাথে যোগ দেন Professor Peter Beyer এবং Dr. Adrian Dubock.  তারা দেখলেন, ভাইটামিন এ তৈরীর জন্য যে প্রক্রিয়া (pathway) দরকার, তা ধান গাছের পাতার মধ্যে পুরোপুরি সক্রিয় এবং এভাবে পাতায় কিছু পরিমাণ তৈরীও হয়। কিন্তু কোন অজানা কারণে Endoplasm- (মানে যে অংশটা আমরা খাই, চালের মধ্যে) এই প্রক্রিয়াটা বন্ধ। তারা খুঁজে খুঁজে এই বন্ধ প্রক্রিয়া চালু করার ব্যবস্থা করলেন। তারা করলেন কি, ড্যাফোডিল নামক গাছ থেকে Phytoene synthase (phy) নামক জিন এবং Erwinia নামক মাটিতে পাওয়া যায় এমন এক ব্যকটেরিয়া থেকে crtI নামক জিন সংগ্রহ করে, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে ধান গাছের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। কেল্লাফতে! এবার চালের মধ্যেই বিটা-ক্যারোটিন (beta carotene)  তৈরী হতে লাগলো। বিটা-ক্যারোটিন থেকেই ‘ভাইটামিন এ’ তৈরী হয়। খাবার পরে এই বিটা-ক্যারোটিন আমাদের শরীরে বিভিন্ন এনজাইমের মাধ্যমে ‘ভাইটামিন এ’তে পরিণত হয়। আর এই চালের রং দেখতে হলো একেবারে স্বর্ণের মতো। এভাবেই এলো গোল্ডেন রাইস।

আগামী পর্বে জানব এর কিছু সম্ভাবনার কথা।

Tech Analyst – Techmorich