ব্যাতিক্রমধর্মী, সাহসী উদ্যোক্তা ইশ্তিয়াক সারোয়ার এর দেশে টেকনোলোজি সেবা দিয়ে অবদান

নভেম্বর ৭, ২০১৫

বাংলাদেশে এ প্রজন্মের যেসব উদ্যোক্তারা টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে নিজের দেশের কথা ভেবে  জনসাধারনের জন্য কিছু করেন, তাদের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন।  ব্যাতিক্রমধর্মী, সাহসী এবং চ্যাল্যেঞ্জিং এমনি একজন উদ্যোক্তা এ,এম,ইশ্তিয়াক সারোয়ার। টেকমরিচের আজকের বিজনেস Entrepreneur ইশ্তিয়াক সারোয়ার। তার কাছ থেকে শুনব  তার স্বপ্নের কথা এবং তার সাথে বিস্তারিত জানব শত চড়াই উৎরাই পার করে নিজের সাফল্যের সিড়ি কিভাবে নিজেই তৈরি করেছেন।

নাম – এ,এম,ইশ্তিয়াক সারোয়ার 
পড়াশুনা – বি এস সি ইন সি এস আই টি এবং এম এস সি ইন সি এস আই টি সাউদার্ন ইউনিভাসিটি, চিটাগং থেকে। ক্যারিয়ার শুরু করেছি ২০০৩ সালে আমার ইউনিভাসিটিতেই লাইব্রেরী ইনফরমেশন অফিসার খন্ডকালীন ২৫০০ টাকার চাকরী দিয়ে।ঠিক তার এক বছর আগে আমি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট নিয়ে আগ্রহী হই এবং আমার ওয়েবে পথ চলা শুরু হয়। একবছরের সাধনায় আমি নিজের স্কীল লেভেল অনেকটাই স্ট্রং করে নিয়ে প্রথম ওয়েবসাইট হিসেবে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট তৈরী করি এবং এটাই ছিল আমার প্রথম কমারশিয়াল ওয়েবসাইট। সেটা অনেক ভালো প্রশংসা পাওয়াতে আমি অনেক সাহস পাই এবং নিজে নিজে আরো কিছু সাইট বানানোর এবং তখনকার টেকনোলজিক্যাল ট্রেন্ড গুলো শেখার চেস্টায় নিজের ১০০% নিয়োজিত করি। তখন গোল্ডেন ওয়েব এওয়ার্ড এর জন্যে ৩টা সাইট ওদের কাছে পাঠাই এবং তা মনোনীত হয়। সেটা আমার কাজের ২য় বড় স্বীকৃতি এবং তাই আমাকে আমার পথ ঠিক করে নিতে সাহায্য করে। এরপর সুযোগ হয় বড় বড় অনেক কোম্পানির সাথে কাজ করার। একের পর এক ক্যারিয়ার এর ১১টা বছর পার করে অনেক কিছু এচিভ করেছি জেনেছি, শিখেছি। তবে এখনো অনেক কিছুই করার আছে।

প্রথম উদ্যোগ সফট টেক ইনোভেশন  –
আমার এই উদ্যোগ নেয়ার পিছনে আমার বাবার উৎসাহ অনেক গুণ ছিলো এবং উনিই এই স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন যে সারাজীবন চাকরী করে তুমি চলতে পারবে না, তোমাকে স্বাবলম্বী হতে হবে, যেমনটা আমি কারোর উপর ডিপেন্ডেন্ট নই। তখন আমি বললাম কি করবো তাহলে… তখন উনিই আমাকে আমার প্রথম উদ্যোগ এর নাম ঠিক করে দিলেন “সফট টেক ইনোভেশন” সেদিনের সেই নামকরণ এর পরে আমার বাবা আমাকে এই উদ্যোগ এর জন্যে লাইসেন্স করে দেয় প্রায় ১বছর পরে ২০০৫ সালের ৭ই জুলাই।

শুরুটা  যেভাবে
প্রথম শুরু হয়েছিল চীনের গুয়াংজু প্রদেশের একটা ট্রেডিং কোম্পাণীর জন্যে ডেস্কটপ বেজড মিনি ই আর পি সফটওয়্যার এর অর্ডার নিয়ে অফিসিয়াল শুরু করা যার মুল্য ছিলো ৫০০০ ডলার। প্রথম কন্ট্রাক্ট সাইন করার সময় তারা দিয়েছিলো ২০০ ডলার সাইনিং মানি।

সফট টেক ইনোভেশন লিঃ এর বর্তমানে প্রায় ৪০০ এর অধিক গ্রাহক কে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে, নিজেদের ডেডিকেটেড সার্ভার এ প্রায় ৯০০+/- ডোমেইন হোস্ট করছে। তিল তিল করে গড়ে তোলা সফট টেক এখন প্রায় একাই শুধু ডোমেইন হোস্ট বিজনেস এ ইনভেস্ট করেছে প্রায় ৩০লক্ষ টাকা । এখন একাই সফট টেক এর মার্কেট ভ্যালু এবং বিজনেস পোর্টফোলিও অনেক শক্তিশালী ছোট কোম্পাণী হওয়া স্বতেও। একজন এক্সপাট কে দিয়ে কোম্পাণীর মুল্যায়ন করা হয়েছিলো সেই হিসেবে এর ভ্যালু এখন প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি যা আমার একক প্রচেস্টায় সম্ভব হয়েছে।

ওয়েব সলিউশন এ নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেই আমি অন্য সেক্টর গুলোতে এক এক করে হাত দেই যেগুলোর সাথে আমার বিজনেস এর ডিরেক্ট রিলেশন আছে যেমন মুঠোফান শুরু করা এবং এরপরে ইবিপনন এবং আমার পে নিয়ে কাজ করা সবই একটা ধারাবাহিকতা মাত্র আমার সুদুর প্রসারী প্ল্যানিং এর। এছাড়া সম্প্রতি নিজস্ব ওয়েব বেজড একাউন্টিং সিস্টেম এবং পয়েন্ট অব সেলস সিস্টেম ডেভেলপ করা হয়েছে এস এম ই উদ্যোগ গুলোকে মাথায় রেখে যাতে রিজনেবল দাম এ তারা সিস্টেম গুলো ক্রয় করে নিজেদের বিজনেস কে গতিশীলতা আনতে পারে।

মুঠোফান
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মোবাইল ম্যাসেজিং এবং কন্টেন্ট সারভিস দেয়ার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করে মুঠোফান, বরতমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে ম্যাসেজিং সারভিস দিচ্ছে, সেই সাথে পুশ পুল ম্যাসেজিং, সাবস্ক্রিপশন সারভিস শর্ট কোড এর মাধ্যমে দিয়ে যাচ্ছে, বাল্ক এবং লোকেশন বেজড ম্যাসেজিং সারভিস দিয়ে সুনামের সাথে বিজনেস করে যাচ্ছে প্রায় ২০০+ অধিক গ্রাহকদের আস্থা নিয়ে। যার মারকেট ভ্যালু দিন দিন আল্লাহর অশেষ রহমতে বাড়ছে এবং একটা টারগেট নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে ভালো সারভিস দিতে, নিজস্ব এস এম এস গেটওয়ে বসানো হয়েছে এই বছরের শুরুতে মধ্য আমেরিকার দেশ বেলিজ এ অন্য একটা প্রতিষ্ঠান এর কারিগরী সহায়তা নিয়ে এতে আমার ম্যাসেজিং সারভিস আরো স্বাবলম্বী হয়েছে। সম্প্রতি স্কুল কলেজ গুলো কে সারভিস দেয়ার জন্যে আমাদের নতুন প্রথম পণ্য “এডুপ্লাস” চালু করা হয়েছে যার মাধ্যমে স্কুল কলেজ এর শিক্ষকরা ক্লাস সামারি, হাজিরা, গ্রিটীংস, নোটিশ, রেজাল্ট পাবলিশ করতে পারবে মাসিক ৩০টাকার বিনিময়ে স্টূডেন্ট প্রতি।

ইবিপনন ডট কম
২০১১ সালে ইবিপনন ডট কম যাত্রা শুরু করার কথা থাকলেও অনেক ইনভেস্টমেন্ট এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় আমরা পিছিয়ে দেই। পরবর্তীতে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইবিপনন আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে অনলাইন রিটেল স্টোর হিসেবে। শুরুতে আমরা সব ধরনের প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করলেও সম্প্রতি নতুন ওয়েবসাইটে যাওয়ার পরে আমরা ইস্টোর ফ্যাসিলিটি যোগ করেছি যার ফলে কোন সাপ্লায়ার কে আমাদের কাছে আর আলাদা করে মেইল করে প্রোডাক্ট আপলোড করতে হবে না, সে নিজেই পারবে আপলোড করতে। তার একটা ইস্টোর ঠিকানা ও পাবে মাসিক ফীর বিনিময়ে এবং আমাদের স্পেশালাইজেশন টা আমরা লাইফস্টাইল প্রোডাক্ট এর দিকে দিয়েছি এবং দিন দিন

আমার পে-
২০১১ সালেই প্ল্যান করা হয়েছিলো এবং এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলাম কিন্তু অনেক বড় পরিমাণ অর্থ সংস্থাপন না করে এই বিজনেস এর সিস্টেম ডেপ্লয় করা যাবে না বিধায় আমাদের এই প্রজেক্ট এর কাজ শুরু করতে করতে ২০১২ সালের শেষ দিক পরযন্ত সময় চলে যায় এবং পরবরতীতে আমরা ২০১৩ সালে এবং ১৪ সালে এই প্রজেক্ট টা বাস্তবায়নে আসে, যার ফলশ্রুতিতে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে আমরা বেটা ভার্সন দিয়ে সিস্টেম এবং সার্ভিস চালু করি যা এখন পুরোদমে চালু মার্কেটে সার্ভিস দেয়ার জন্য। ভালো সারভিস, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ করে, আকরষণীয় ট্রাঞ্জেকশন ফী এবং মার্চেন্ট দের উন্নত সেবা দেয়ার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করেছে, ভালো সাড়াও পেয়েছি আমরা। সফট টেক ইনোভেশন লিঃ এর অংগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালু করা হলেও লিগ্যাল কারণে অদুর ভবিষ্যতে তা আলাদা বিজনেস আইডেন্টিটি হিসেবে পরিচিত হবে।

আমার প্রতিবন্ধকতাগুলো-
আমার প্রথম প্রতিবন্ধকতা ছিলো আমি রানিং ক্যাপিট্যাল ছাড়া বিজনেস এ নেমেছি, নিজে জব করেছি পাশাপাশি বিজনেস কে গ্রো করার চেস্টা করেছি। নেটওয়ার্ক এবং পরিচিতি গড়ে তুলতে বেশি সময় নিয়েছি। পরিচিতি বাড়াতে প্রজেক্ট এবং অর্ডার পেতে থাকায় সেখান থেকে আসা আয় এবং লাভের অংশ দিয়ে বিজনেস এ রিইনভেস্ট করে করে এগিয়েছি। খুব বড় কোন ফান্ড কোন দিন পাইনি। বড় ফান্ড না পাওয়ার দরুন আমার যখন যে সময়ে যে প্রগ্রেস পাওয়া উচিত ছিলো তা পেতে আমার বেশি সময় লেগেছে যা অন্যরা বেশি ইনভেস্টমেন্ট থাকায় আমার আগেই অর্জন করেছে।

যেভাবে এগিয়ে গেলাম –
আমার ব্যবসার প্রথম দিককার দিন গুলো গিয়েছে চিটাগং এ। আমার বিজনেস এর রেজিস্ট্রাড অফিস চিটাগং। আমি আই এস পি তে জব করার সুবাদে অনেক মানুষের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পাই এবং সেই সুযোগ গুলোকে কাজে লাগিয়ে আমি আমার বিজনেস এ নতুন নতুন গ্রাহক পেতে শুরু করি। ২০০৫ এর পরের দিকে তখন আমার ছোট টীম ছিলো, ট্র্যাডিশনাল প্রমোশন কখনো করতে হয়নি। রেফারেন্স এর উপর ভিত্তি করেই আমার অনেক গুলো আন অফিসিয়ালি অনেক গুলো রিসেলার বা এজেন্ট তৈরী হয়ে যায় যারাই বিজনেস দিতো ওয়েবসাইট এর ওয়ার্ক লোকাল প্রজেক্ট গুলো প্রতি মাসেই এবং ফ্রিল্যান্সার মার্কেটপ্লেস freelancer.com ভালো কিছু পার্মানেন্ট গ্রাহক পেয়ে যাওয়াতে ওয়েব এর উপর ভিত্তি করে আমার কাজ গুলো এগুতে থাকে ২০০৬ এবং এর এরপরের দিকে। যারা আমাদের শুরুর দিককার প্রায় ১১ বছর ধরে আমাদের সাথেই আছে, এবং আমাদের উপরেই আস্থা রেখে চলেছে।

বর্তমান অবস্থা,  সফলতা-এবং ব্যার্থতা –
বর্তমান অবস্থা হচ্ছে সফট টেক ইনোভেশন লিঃ এর এখন অনেক গুলো সাপোটিভ সারভিস উইং আছে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নিম্নোক্ত উদ্যোগ গুলো –

রেডিও বিজয় – ২০০৯ সালে রেডিও বিজয় নামে একটা অনলাইন রেডিও স্টেশন করেছিলাম এবং ভালো রকম ইনভেস্ট করে প্রচারণা এবং পরিচিতি পেয়েছিলো কিন্তু দক্ষ জনবল, মারকেট প্রস্পেক্ট না থাকায় বাধ্য হয়ে রেডিও স্টেশন টা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। আই কল শপঃ আই এস পি তে কাজ করার সুবাদে ভি ও আই পি সারভিস নিয়ে বেশ কিছুদিন ঘাটাঘাটি করেছিলাম, তবে ৩ বার ট্রাই করেও আমি এই বিজনেস এ ইন ডেপথ যেতে না পারায় এই বিজনেস টাও বেশি দিন টিকেনি।

প্রচারণার ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করছি –
ওয়ার্ড অব মাউথ এর এডভান্টেজ নিয়েছি এবং এটাই আমাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে, এছাড়া স্বল্প পরিসরে ফেসবুক প্রমোশন, এস এম এস প্রমোশন করা হয়েছে, পাশাপাশি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্রেজেন্স কে কাজে লাগিয়েছি যা আমার বিজনেস এর প্রমোশন এর ক্ষেত্রে সহায়ক ভুমিকা পালণ করেছে।

আগামীর জন্য পরিকল্পনা –
আগামীতে পরিকল্পণা হচ্ছে আমাদের বরতমান যেসব সারভিস উইং আছে সেগুলোকে আরো ভালো ভাবে সারভ করা এবং ক্লায়েন্ট কে ওয়ান স্টপ সলিউশন অফার করা যা গ্রাহকে ভোগান্তি অনেক অংশে কমিয়ে ফেলবে। যেহেতু আমরা আমাদের গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেছি এর মধ্যেই তাই আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে তা ধরে রাখা এবং বরতমান অফারকৃত সারভিস কে আরো উন্নত এবং বিশেষায়িত করা।

ভবিষৎ এ  প্রতিষ্ঠানকে কোন অবস্থানে দেখতে চান?
অবশ্যই দেশের প্রথম সারির আই টি এনাবল্ড সারভিস প্রোভাইডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই যেহেতু আমাদের সব গুলো ব্র্যান্ডই সারভিস ওরিয়েন্টেড তাই আমাদের লক্ষ্য নিজেদের বেস্ট টা প্রেজেন্ট করে মারকেট লিডার হওয়া।

নতুন যারা এই ব্যবসায় আসতে চান তাদের জন্য পরামর্শ –
নিত্য নতুন আইডিয়া আসবে তবে তা যদি ইমপ্লিমেন্ট করতে না পারা যায় তবে সেই আইডিয়ার কোন মুল্য নেই, টাকা নেই তাই বিজনেস করা যাবে না এমন ধারণাও অমুলক, নিজেকে আগে শুরু করে দিতে হবে এরপরে অবশ্যই একটা না একটা পথ বের হয়ে আসবে ফান্ডিং এর তবে এর আগে নিজেকে সেই আইডিয়া কে ইমপ্লিমেন্ট এ নিয়োজিত করা লাগবে তবেই সাফল্য ধরা দিবেই এবং লেগে থাকার মানসিকতা থাকা লাগবে নচেত যা করতে চাইছে তাতে সাফল্য আসবেই না।


Rifat Ara
– Tech Reporter